শহীদ রায়হান
নির্মাতা। লেখক।
বাংলাদেশ যেন এক দীর্ঘ ক্লান্তির যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার রঙিন প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ধুলোমাখা দিনগুলো একসময় গিয়ে যেখানে মিশে গেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ আজ নতুন এক প্রশ্ন তোলে—একটি রাষ্ট্র কি কখনো এতটাই অকার্যকর হয়ে যেতে পারে যে নাগরিকেরা ভাবতে বাধ্য হয়: দেশটা যেন পতাকা ধরে রাখুক, মানচিত্র ধরে রাখুক, কিন্তু জীবন চালানোর সব ব্যাবস্থা যদি উন্নত কোনো দেশের কাছে লিজ দিয়ে দেওয়া যেত! প্রশ্নটি নির্লজ্জের মতো শোনায়, কিন্তু তা জন্ম নেয় লজ্জা থেকে নয়, বরং গভীর বেদনা ও ব্যর্থতার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে।
রাজনীতির চর্চা এদেশে কখনোই কেবল জনস্বার্থের উপর দাঁড়িয়ে থাকেনি। বরং তা দল, ব্যক্তি ও ক্ষমতার অদ্ভুত এক সমীকরণের উপর দাঁড়ানো। যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের রং এবং পছন্দে সাজিয়েছে, আবার যারা ক্ষমতার বাইরে গেছে, তারা এক ধরনের প্রতিহিংসা ও পুনঃদখলের আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে রেখেছে। বিরোধী মত আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় তৈরি হয়েছে শত্রুতার সংস্কৃতি। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো জনসেবা নয়, বরং ক্ষমতার অলঙ্কার সংগ্রহ করে—এমন ধারণা দিন দিন আরও জোরালো হতে থাকে।
এই অস্থিরতার মাঝে নাগরিক সেবার কাঠামো ভেঙে পড়েছে অনেক আগেই। লাইনের দেশে লাইনই যেন রাজনীতি; সেবা পাওয়ার আগে মানুষকে প্রমাণ করতে হয় তাদের দলীয় পরিচয়, প্রভাব, সম্পর্ক বা ‘সিস্টেমে ঢোকা’ ক্ষমতা। নাগরিক সেবা যেন অধিকার নয়—একটি কঠিন অভিযাত্রা, যেখানে হাসপাতালের বেড, পুলিশের সহায়তা, স্থানীয় সরকারের কোনো নোটিশ বা ন্যায্য সুবিধা… সবকিছুই নির্ভর করে ক্ষমতাসীন কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে আপনার দূরত্ব বা ঘনিষ্ঠতার উপর। এই অকার্যকর ব্যবস্থা মানুষকে এমন এক অবস্থায় ঠেলে দেয় যেখানে তারা তুলনা করতে শেখে—কেন সিঙ্গাপুরে সেবা এত সহজ? কেন স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোতে দুর্নীতির জায়গা নেই? কেন জাপানে রাজনৈতিক দল যাই থাকুক, রাষ্ট্রযন্ত্র চলতে পারে নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ববোধে? সেই তুলনা থেকেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত কল্পনা—যদি এই পুরো সিস্টেমটি উন্নত কোনো রাষ্ট্রের হাতে হতো! আমরা হয়তো পরিচ্ছন্ন শহর, নিরাপদ চিকিৎসা, স্বচ্ছ করব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন পেতাম। নাগরিক জীবন হতো আরো সহজ, আরও সমতাভিত্তিক।
অর্থনীতির গল্পটাও খুব আলাদা নয়। পরিকল্পনা যত সুন্দর, বাস্তবায়ন ততটাই দুর্বল। প্রকল্পের সময় বাড়ে, বাজেট ফুলে ওঠে, মান কমে যায়। ব্যাংকিং খাতে চুরি-লুট যেন এক ধরনের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর করব্যবস্থার স্বচ্ছতার কথা বলতেই হাসি পায়—কর দিতে গিয়ে মানুষ যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কে ভোগে, কারণ তারা জানে তাদের দেওয়া অর্থের কতটা দেশের কাজে লাগবে আর কতটা কোনো অদৃশ্য পকেটে ঢুকে যাবে তা কেউ জানে না। এই ব্যর্থতার ইতিহাসই মানুষকে ভাবায়, যদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা জাপান বা নরওয়ে বা সুইজারল্যান্ডের হাতে হতো—তাহলে কি আমাদের উন্নয়ন আরও দ্রুত, আরও স্থিতিশীল হতো না?
কিন্তু অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গভীর শিকড় আরেক জায়গায়—মানুষ গড়ার ক্রমাগত ব্যর্থতায়। একটি রাষ্ট্র তখনই অকার্যকর হয়ে পড়ে যখন নাগরিকরা নিজেরাই দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, সততা ও সামষ্টিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলতে থাকে। বাংলাদেশে নৈতিক শিক্ষার অভাব বিস্ময়কর নয়; বরং তা এতটাই দৈনন্দিন যে মানুষ এখন আর অনৈতিকতাকে অনৈতিক ভাবেই না—এটিকে তারা ‘চালাকি’, ‘স্মার্টনেস’ বা ‘সামাজিক দক্ষতা’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। সন্তানদের শিক্ষা শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো নম্বর বা ছকবদ্ধ পেশার দিকে ঠেলে দেয়, কিন্তু জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, সততা, নাগরিক চেতনা, দায়িত্ব ও ন্যায়পরায়ণতা শেখায় না। ফলে সমাজে তৈরি হয় দক্ষ মানুষের অভাব নয়, বরং নৈতিক মানুষের অভাব—যারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে, ক্ষমতার নয়।
এমন পরিস্থিতিতে লিজ–রাষ্ট্রের ধারণা একপ্রকার ব্যাধিগ্রস্ত আত্মমর্যাদার প্রকাশ। মানুষ জানে এটি কখনো বাস্তবে ঘটতে পারে না; একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র অন্য দেশে লিজ দেওয়া যায় না। তবুও কেন তারা এই কল্পনাকে বুকে ধারণ করে? কারণ এই কল্পনা আসলে এক ধরনের প্রতিবিম্ব—যেখানে তারা নিজ দেশের ব্যর্থতাকে স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। লিজের ধারণা যেন একটি আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হয় প্রজন্মের পর প্রজন্মের সঞ্চিত ক্লান্তি, অব্যবস্থাপনা, হতাশা এবং স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস।
তবে এই কল্পনার ভিতরেও একটি সম্ভাবনার আলো লুকিয়ে থাকে। মানুষ যখন নিজের অক্ষমতা এত স্বচ্ছভাবে দেখতে শেখে, তখনই সে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হয়। রাষ্ট্রের সেবাগুলো লিজ দিয়ে নয়, বরং নিজেরাই সংস্কার করে—এটাই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় পদক্ষেপ। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেশাদার ও মানবিক হতে হবে; প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে; অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির উপর দাঁড় করাতে হবে; আর সর্বোপরি মানুষকে মানুষ হিসেবে তৈরি করতে হবে—আদর্শ, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক চেতনার ভিতরে।
কারণ শেষ কথা হলো—
একটি দেশ পতাকা আর মানচিত্র দিয়ে টিকে থাকে না,
টিকে থাকে তার মানুষের চরিত্র দিয়ে।
যে জাতি নিজের মানুষকে গড়ে তুলতে পারে না, তাকে কেউ এসে গড়ে দেবে না—এমনকি লিজেও নয়।
বাংলাদেশ যদি নিজের সংকটগুলোকে স্বীকার করতে পারে এবং পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হতে পারে, তাহলে লিজ-রাষ্ট্রের কল্পনা আর প্রয়োজন হবে না; বরং বাংলাদেশ নিজেই হয়ে উঠবে নিজের সেরা সংস্করণ—সক্ষম, মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও উন্নত এক রাষ্ট্রচেতনায় পুনর্জাগরিত।